হাওয়াইয়ের কাইলুয়া-কোনায় অনুষ্ঠিত আয়রনম্যান ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে এবছর এক অবিশ্বাস্য কীর্তির সাক্ষী হলো বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের ৮০ বছর বয়সী ন্যাটালি গ্র্যাবো কঠিনতম এই ট্রায়াথলন শেষ করে হয়ে গেলেন ইতিহাসের অংশ—কোনা রেস শেষ করা সবচেয়ে বয়সী নারীর খেতাব এখন তাঁর।
গ্র্যাবো যখন ফিনিশ লাইনের ফিতাটা ছিঁড়ে দিলেন, তখন তাঁর ঘড়িতে সময় ছিল ১৬ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট ২৬ সেকেন্ড—মাত্র ১৪ মিনিট আগে, ১৭ ঘণ্টার সর্বোচ্চ সময়সীমার। হ্যাঁ, এই রেসে সময়ের সঙ্গে লড়াই করাটাও বড় একটা চ্যালেঞ্জ।
তাপমাত্রা ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস), আর্দ্রতা ৭০ শতাংশের কাছাকাছি—এই কঠিন আবহাওয়ায় ২৬.২ মাইল (৪২.২ কিলোমিটার) ম্যারাথন দৌড় যখন শুরু করেন, তখন তাঁর হাতে মাত্র ৭ ঘণ্টা সময়। তাঁর ভাষায়, “আমি জানতাম আমাকে এটা শেষ করতেই হবে। আমি পারব—সেটা জানতাম।”
এটা ছিল এই প্রতিযোগিতায় তাঁর ১১তম অংশগ্রহণ। আর হ্যাঁ, তিনি শুধু ‘অংশগ্রহণ’-এর জন্য অংশগ্রহণ করেন না—তিনি প্রতিযোগিতা করতেই যান।
৫০-র পর শুরু, ৬০-তে আয়রনম্যান
ন্যাটালি গ্র্যাবো এখন নিউ জার্সির মাউন্টেন লেকসে থাকেন। তিনি যখন ছোট ছিলেন, তখন মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। টাইটেল নাইনের (১৯৭২ সালের নাগরিক অধিকার আইন যা মেয়েদের খেলার সুযোগ দেয়) আগে বড় হওয়া ন্যাটালির ভাষায়, “আমরা শুধু ছেলেদের খেলা দেখতাম, চিয়ারলিডার হতাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে চেয়েছি আমিও যেন খেলতে পারতাম।”
চাকরি, সংসার আর দুই মেয়েকে বড় করার ফাঁকে ফাঁকে কিছুটা টেনিস খেলতেন। কিন্তু মেয়েরা বড় হয়ে গেলে আবার কাজে ফেরেন—বেল ল্যাবসে একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে। টেনিস খেলার সময় কমে এলো, তবে দৌড় শুরু করলেন বন্ধুদের সঙ্গে।
তাঁর বয়স যখন ৫৯, তখনও সাঁতার জানতেন না। ৬০ বছর বয়সে তিনি প্রথম আয়রনম্যান ট্রায়াথলনের হাফ ডিস্ট্যান্স (৭০.৩ মাইল) শেষ করেন। পরের বছরেই ফুল আয়রনম্যান—২.৪ মাইল সাঁতার, ১১২ মাইল সাইক্লিং, ২৬.২ মাইল দৌড়—সব শেষ করে ফেলেন।
“সাঁতার আমার দুর্বল দিক, কিন্তু করে ফেলেছি”
২০০৪ সালে প্রথম স্থানীয় এক ট্রায়াথলনে অংশ নেন। সাঁতার না জানায়, বড় মেয়েকে দিয়ে সেই অংশ করিয়ে বাকিটা নিজে করেন। অভিজ্ঞতা এতটাই ভালো ছিল যে তিনি ঠিক করেন—সাঁতার শিখতেই হবে।
ভিডিও দেখেছেন, বই পড়েছেন, YMCA-তে গিয়ে সাহায্য চেয়েছেন। এক বছরের মাথায় নিজেই অংশ নেন পূর্ণ ট্রায়াথলনে। “সাঁতারটা দারুণ ছিল না, তবে ঠিকই করে ফেলেছিলাম,” তিনি বলেন।
২০০৫ সালের শেষেই তিনি হাফ-আয়রনম্যান শেষ করেন, এবং পরের বছর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ফুল ডিস্ট্যান্সের জন্য যোগ্যতা অর্জন করে নেন। এবার সেই একই ট্র্যাক, ১৬ বার অংশ নিয়েছেন, ১১ বার সফলভাবে শেষ করেছেন।
“আমি সংখ্যা দিয়ে মোটিভেটেড হই”
৮০ বছর বয়সেও তাঁর অনুশীলন রুটিন একজন পেশাদার অ্যাথলেটের মতো। সপ্তাহে চার দিন সাঁতার, চার দিন বাইক, এবং সপ্তাহে ১৮ মাইল দৌড়ান। প্রতিদিন স্ট্রেচিং, ইয়োগা ও স্ট্রেন্থ ট্রেনিং করেন।
বাইরের সড়কে সাইকেল চালানো এখন নিরাপদ মনে না হওয়ায়, ইন্ডোর ট্রেইনারেই ৫ ঘণ্টার সেশনে কাজ করেন। মিউজিক শুনলেও সেটা তাঁর মোটিভেশনের উৎস না। তাঁর কথায়, “আমি মিউজিক দিয়ে না, সংখ্যা দিয়ে মোটিভেটেড হই।”
চোট? একবার রোটেটর কাফের সার্জারি করিয়েছেন, তবু এখন পর্যন্ত কোনো কৃত্রিম হাঁটু বা হিপ লাগাতে হয়নি।
এই যাত্রাই শেষ নয়
আগামী বছর আবারও তিনটি হাফ-আয়রনম্যান রেসে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করেছেন—নিউ ইয়র্ক, মেরিল্যান্ড এবং সম্ভবত জোনস বিচ, লং আইল্যান্ডে।
তাঁর কাছে প্রতিটি অনুশীলনই আনন্দের। “আজ সাইক্লিং করতে পারব—ভালো লাগছে। আজ দৌড়—চমৎকার। আজ সাঁতার আর সাইক্লিং—এটা তো ডাবল মজা,” হেসে বলেন তিনি।
তাঁর গল্পে মানুষ অবাক হন—হাওয়াই প্রতিযোগিতা শেষ করা ৮০ বছরের এক নারী! কিন্তু তিনি চান, মানুষ তাঁর গল্পে অনুপ্রাণিত হোক।
“আমার আশা, মানুষ বুঝতে পারবে তারা নিজেদের ভাবনার চেয়ে আরও একটু বেশি করতে পারে, আরও বেশি এগোতে পারে। হাঁটাচলা করাটা শরীর ও মনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বুঝতে পারলেই আমার কষ্ট সার্থক।”